মতভিন্নতা, বিভাজন এবং অসহিষ্ণুতার নেপথ্যে শেখার পদ্ধতির ভিন্নতা

১. একটি সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে

প্রায়ই বিভিন্ন মতবাদের অনুসারীদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক-কুতর্ক প্রত্যক্ষ করি, আর প্রতিবারই মনে হয়—এ যেন একই ভাষায় কথা বলেও দুজন মানুষের পরস্পরকে না বোঝার এক করুণ নাট্য। শব্দ উচ্চারিত হয়, কিন্তু অর্থ পৌঁছায় না। যুক্তি উপস্থাপিত হয়, কিন্তু গৃহীত হয় না প্রতিপক্ষের কাছে। এই অসংলাপের সংকট থেকেই এই লেখার জন্ম—আমাদের শিক্ষা ও শেখার পদ্ধতি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকলে হয়তো অনেক কুতর্ক এড়ানো সম্ভব হতো।

মানুষের জন্য বুঝ বা উপলব্ধি (comprehension) আল্লাহ প্রদত্ত সর্বোৎকৃষ্ট দান। ভালো-মন্দের পার্থক্যকরণ ক্ষমতা—যাকে প্রচলিত অর্থে “কমনসেন্স” বলা হয়—কমবেশি প্রতিটি মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান। তবু প্রশ্ন থেকে যায়: যে বুঝ সর্বজনীনভাবে বিতরিত, তা থেকে এত বিচিত্র, এত পরস্পরবিরোধী মত কীভাবে উৎসারিত হয়? এই নিবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য হলো—এর কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক তারতম্য নয়, বরং চিন্তাপদ্ধতির (mode of thinking) বৈচিত্র্য। গন্তব্য অভিন্ন হলেও তাতে পৌঁছানোর পথ ভিন্ন হতে পারে; একই নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে দুজন মানুষ একই জল দেখেও ভিন্ন স্রোতের কথা বলতে পারেন।

এই প্রসঙ্গে সুফি সাহিত্যে বহুল ব্যবহৃত “অন্ধের হস্তী দর্শন” রূপকটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। এক অন্ধ ব্যক্তি লেজ স্পর্শ করে হাতিকে রজ্জুসদৃশ বলেন, আরেকজন পা স্পর্শ করে প্রাচীরসদৃশ এবং অপরজন কর্ণ স্পর্শ করে পত্রসদৃশ মনে করেন। প্রতিটি উপলব্ধিই আংশিকভাবে সত্য; সমস্যাটি সামগ্রিকতার (holism) অভাবে, ভ্রান্তিতে নয়। কিন্তু এই রূপকের একটি নীরব হুঁশিয়ারিও আছে—যদি অন্ধেরা পরস্পরের অনুভূতিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জেদে অবতীর্ণ হন, পারস্পরিক বোঝাপড়ার বদলে যদি প্রতিটি অন্ধ নিজের স্পর্শকেই একমাত্র সত্য বলে আঁকড়ে ধরেন, তবে সেই অন্ধকার ঘরেই জন্ম নেয় বিবাদ, এমনকি সহিংসতাও। আমাদের সমকালীন রাজনৈতিক-সামাজিক সংকট অনেকটাই সেই অন্ধকার ঘরের প্রতিচ্ছবি।

কোনো বিষয়ের অন্তর্নিহিত কারণ চার-পাঁচটি বা ততোধিক হতে পারে। প্রত্যেকে এই সবগুলো কারণ বিবেচনা করে নিজস্ব বুঝ গঠন করেন না—কেউ একটি, কেউ দুটি, আবার কেউ সামগ্রিকভাবে সবগুলো কারণকে আমলে নিয়ে মতামত গঠন করেন। এখানেও কোনো পক্ষ সম্পূর্ণ ভুল নয়; এটি কেবল সামগ্রিকতার মাত্রাগত পার্থক্য। প্রতিটি মানুষের জীবনপথ ও অভিজ্ঞতার স্বাতন্ত্র্যও এই ভিন্নতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

২. শেখার পদ্ধতিগত তত্ত্ব-হানি ও মামফোর্ডের কাঠামো:

মানুষ কেন একইভাবে চিন্তা করে না—এই প্রশ্নের একটি সহজ উত্তর হলো: মানুষ একইভাবে শেখে না। ব্যক্তি যেভাবে শেখেন, সেভাবেই তিনি তা প্রকাশ করেন ও চর্চা করেন, যা তর্ক-বিতর্কে প্রতিফলিত হয়—যেন প্রতিটি কণ্ঠস্বর তার নিজস্ব শেখার ইতিহাসকে বহন করে চলে, অজান্তেই। শিক্ষাতাত্ত্বিক পিটার হানি ও অ্যালান মামফোর্ড তাঁদের The Manual of Learning Styles (1986) গ্রন্থে চারটি প্রধান লার্নিং স্টাইল চিহ্নিত করেন। সাঁতার শেখার দৃষ্টান্ত দিয়ে এই চারটি ধরন ব্যাখ্যা করা যায়:

২.১ অ্যাক্টিভিস্ট (Activist): গ্রামীণ পরিবেশে শৈশবে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার শেখার অভিজ্ঞতা এই ধরনের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রাথমিক পর্যায়ে পানি খাওয়া, চোখ জ্বালা করা সত্ত্বেও পুনরায় ঝাঁপ দেওয়ার মধ্য দিয়ে শেখা—অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করে সরাসরি অভিজ্ঞতায় নিমজ্জিত হয়ে শেখার এই প্রাকৃতিক, প্রায় দুঃসাহসী পদ্ধতিকে অ্যাক্টিভিস্ট লার্নিং বলা হয়। এই গোষ্ঠীর কাছে জীবন নিজেই পাঠশালা; বিপদের ঝুঁকি নিয়েই তারা সত্যের সন্ধান পান।

২.২ রিফ্লেক্টর (Reflector): প্রথমবার পানিতে নেমে তিক্ত অভিজ্ঞতা কাউকে সতর্ক করতে পারে, অথবা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে অন্যদের পর্যবেক্ষণ করে শেখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। অন্যের অভিজ্ঞতা ও ভুল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে, ধৈর্য ধরে দূর থেকে নিরীক্ষণ করে শেখার এই পদ্ধতিকে রিফ্লেক্টর বলা হয়—যেন পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি জলের গভীরতা বোঝার আগে ঢেউয়ের ভাষা পড়তে শেখেন।

২.৩ প্র্যাগমাটিস্ট (Pragmatist): নগরকেন্দ্রিক সুইমিং পুলে সাঁতার শেখার পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা, কিংবা ঝুঁকি এড়াতে নিরাপত্তা সরঞ্জাম (যেমন সুইমিং জ্যাকেট, চশমা) ব্যবহারের প্রবণতা প্র্যাগমাটিস্ট শিখনের বৈশিষ্ট্য। এই গোষ্ঠী আদর্শের চেয়ে কার্যকারিতাকে, তত্ত্বের চেয়ে ফলাফলকে অগ্রাধিকার দেয়।

২.৪ থিওরিস্ট (Theorist): সাঁতার শেখার পূর্বে সম্পর্কিত গ্রন্থ, ম্যানুয়াল পর্যালোচনা, সম্ভাব্য বিপদ চিহ্নিতকরণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন এবং পূর্ববর্তী তিন ধরনের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতিকে থিওরিস্ট লার্নিং বলা হয়। এটি ধীরগতির, পরিকল্পিত ও বিশ্লেষণাত্মক—যেন জলে নামার আগেই মন একটি মানচিত্র এঁকে নেয়।

হানি-মামফোর্ড তত্ত্ব অনুসারে কোনো ব্যক্তি আজীবন একটি নির্দিষ্ট স্টাইলে আবদ্ধ থাকেন না। জীবনপরিক্রমায় এবং বিষয়ভেদে একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে শিখতে পারেন—যদিও একসাথে বহুবিধ পদ্ধতিতে শেখা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বিরল। উল্লেখ্য, এই চারটি ধরনের কোনোটিই অন্তর্নিহিতভাবে ভুল বা একমাত্র সঠিক নয়; বরং এগুলো ভিন্ন ভিন্ন বৈধ জ্ঞানতাত্ত্বিক পথ। ব্যক্তির শেখার ধরন তার কর্ম, চর্চা, তর্কপদ্ধতি ও সম্পাদনে (performance) প্রতিফলিত হয়—এমনকি একই পরিবার, একই সংগঠন বা একই মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্যেও এই পার্থক্য লক্ষণীয়, কারণ শেখার এই ভিন্নতা মূলত ব্যক্তিগত।
আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে আমাদের সংকটের প্রথম বীজ।

যে মুহূর্তে একটি গোষ্ঠী তার নিজস্ব শেখার পদ্ধতিকে একমাত্র বৈধ পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তখন বাকি তিনটি পথ “অজ্ঞতা” বা “বিভ্রান্তি” হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়ে। এই চিহ্নিতকরণই ধীরে ধীরে বিভাজনের প্রাচীর গড়ে তোলে—এক অদৃশ্য, অথচ অনতিক্রম্য প্রাচীর, যার দুই পাশে দাঁড়িয়ে দুই দল একই ভাষায় চিৎকার করেও পরস্পরের কাছে নিঃশব্দ থেকে যায়।

৩. একাডেমিক শিক্ষা ও চিন্তাপদ্ধতির রূপান্তর:

শেখার এই পদ্ধতিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দ্বারাও প্রভাবিত হয়। বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয় অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সাথে সাথে চিন্তাপদ্ধতিতে স্বাভাবিক রূপান্তর ঘটে—চিন্তা ক্রমান্বয়ে যৌক্তিক ও কাঠামোবদ্ধ রূপ ধারণ করে, যেন কাঁচা মাটি পুড়ে মৃৎপাত্রে রূপান্তরিত হয়, কিন্তু সেই রূপান্তরে মাটির আদি গন্ধ হারিয়েও যায় না, আবার অবিকৃতও থাকে না। সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্তদের চিন্তাপদ্ধতি ফলিত বিজ্ঞানের (applied science) শিক্ষার্থীদের থেকে স্বতন্ত্র হতে বাধ্য। অনুরূপভাবে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগবঞ্চিতদের চিন্তাপদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিতদের থেকে ভিন্ন হবে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ, প্রায় অস্বস্তিকর প্রশ্ন দেখা দেয়—আমাদের সংকটের দ্বিতীয় স্তর: এই দ্বিবিভাজনে কে কাকে অনুধাবন করবে? প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানসম্পন্নরা আমজনতাকে, নাকি বিপরীতটি? ইতিহাস সাক্ষী, এই প্রশ্নের উত্তর প্রায়ই ক্ষমতার ভাষায় লেখা হয়েছে—যার হাতে কণ্ঠস্বর আছে, সত্যও তারই বলে গণ্য হয়েছে। আর যাদের কণ্ঠস্বর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি, তাদের বুঝ “অশিক্ষিত” বলে অবজ্ঞাত হয়েছে—যদিও সেই বুঝের ভেতরেও থাকতে পারে জীবনসংলগ্ন এক গভীর প্রজ্ঞা, যা গ্রন্থাগারের তাকে ধরা পড়ে না।

পারিবারিক ও ধর্মীয় পরিবেশ, আর্থ-সামাজিক শ্রেণি ও বিভাজনের পার্থক্যও শিক্ষা ও শেখার পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য আনে। এই পার্থক্যসমূহ অনুধাবন করতে পারলে জীবন ও জগৎ সম্পর্কীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে অনিবার্যভাবে পরিবর্তন আসে—কিন্তু এই অনুধাবনের পথ যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটাই দুর্গম, কারণ নিজের শেখার পদ্ধতিকে আপেক্ষিক ভাবা মানুষের জন্য এক ধরনের আত্মবিসর্জনের শামিল মনে হয়।

৪. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসহিষ্ণুতা: সংকটের বর্তমান রূপ:

সমকালীন প্রেক্ষাপটে লক্ষণীয় যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যেন তাদের অনুসারীদের পেশীশক্তি প্রদর্শনের জন্য লেলিয়ে দিয়েছে—প্রতিটি স্ক্রিন এখন এক ক্ষুদ্র রণাঙ্গন, প্রতিটি মন্তব্য এক তীক্ষ্ণ অস্ত্র। বিকল্প ব্যাখ্যায়, রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্ব ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন মতাদর্শের অনুসারীরা নিজ নিজ আধিপত্য (hegemony) প্রতিষ্ঠায় তৎপর। যখন রাজনৈতিক পরিসরে কথা বলার, দ্বিমত প্রকাশের বৈধ পথ সংকুচিত হয়ে আসে, তখন সেই দমিত কণ্ঠস্বর অন্য পথে—প্রায়ই আক্রমণাত্মক পথে—বিস্ফোরিত হয়।

এই প্রক্রিয়ায় “অ্যাক্টিভিস্ট” চিন্তাসীমার ব্যক্তিরা “প্র্যাগমাটিস্ট বা থিওরিস্ট” চিন্তায় অভ্যস্তদের প্রতি ব্যক্তি-আক্রমণ, কটাক্ষ ও অবমাননা প্রদর্শন করেন—তাদের কাছে বিশ্লেষণ মানেই কাপুরুষতা, ধীরতা মানেই বিশ্বাসঘাতকতা। বিপরীতক্রমে, “প্র্যাগমাটিস্ট বা থিওরিস্ট” ধারার ব্যক্তিরা সাধারণ জনতা বা অ্যাক্টিভিস্টদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন—তাদের কাছে তাৎক্ষণিকতা মানেই অপরিপক্বতা, আবেগ মানেই অযৌক্তিকতা। দুই পক্ষই নিজ নিজ সত্যের আংশিকতাকে ভুলে গিয়ে সম্পূর্ণতার দাবি করে বসে—আর সেখানেই জন্ম নেয় সেই অসহিষ্ণুতা, যা আজ আমাদের সামাজিক বুনন ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।

৫. উপসংহারঃ সংকট থেকে সম্ভাব্য নিরাময়ের পথ:

যখন কোনো ব্যক্তি নিজস্ব উপলব্ধিকে “একমাত্র সত্য” গণ্য করে অপরের উপলব্ধিকে ভ্রান্ত ও খারিজযোগ্য মনে করেন, তখন বিষয়টির সামগ্রিক উপলব্ধির সুযোগ বিনষ্ট হয় এবং মতবিরোধের জন্ম হয়। এই মতবিরোধ যখন ক্ষমতা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সাথে সম্পৃক্ত হয়, তখন তা অসহিষ্ণুতার বিস্তার ও উগ্রতার জন্মদানে পর্যবসিত হয়—আর এই উগ্রতাই আজ আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার এক নিত্যসঙ্গী।

যদি আমরা স্বীকার করি যে অ্যাক্টিভিস্ট, রিফ্লেক্টর, প্র্যাগমাটিস্ট ও থিওরিস্ট—প্রতিটি পথই হাতির এক একটি অঙ্গ স্পর্শের মতো আংশিক সত্য বহন করে, তবে আমরা প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং সহযাত্রী হিসেবে দেখতে শিখব—যে সহযাত্রী আমার অদেখা অংশটুকু স্পর্শ করেছে। এই অনুধাবনই হতে পারে আমাদের বিভাজিত সমাজের জন্য সেই সেতু, যা পেশীশক্তি ও হেজিমনির রাজনীতিকে প্রতিস্থাপন করতে পারে পারস্পরিক স্বীকৃতির রাজনীতি দিয়ে। শেখার পদ্ধতিগত বহুত্বকে স্বীকার করাই হতে পারে পারস্পরিক সহিষ্ণুতা পুনর্নির্মাণের একটি বাস্তবসম্মত প্রথম পদক্ষেপ—কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়, কিন্তু একটি প্রারম্ভিক আলো, যা অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্ধদের একে অপরের হাত ধরতে সাহায্য করতে পারে।

ফেইসবুকে প্রকাশ, ৩০ জুন ২০২১